৩০শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ , রাত ১১:০১ , বৃহস্পতিবার

এবার তিন চাকার মোটরসাইকেল তৈরি করেছে পিএইচপি

0

নওরোজ ডেস্ক :  মোটরসাইকেল মানেই দুই চাকার। পিএইচপি ফ্যামিলি এবার তিন চাকার মোটরসাইকেল তৈরি করে নতুন চমক আনছে । মোটরসাইকেল হলেও সেডান কারের মতো আরামদায়ক ভ্রমণ ও নিরাপত্তা নিশ্চয়তা মিলবে বাইকটিতে। চট্টগ্রামে পিএইচপির নিজস্ব কারখানায় একদল তরুণ ও চৌকস প্রকৌশলী এই মোটরসাইকেল নির্মাণ করে পরীক্ষামূলক চালিয়ে সফল হয়েছে। এখন বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনের অপেক্ষায় উদ্যোক্তারা।

পিএইচপির ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মহসিন বলেন, ‘গাড়ি সংযোজন কারখানা মানেই একটি দেশের প্রাণ। কারণ এর সঙ্গে অনেক ছোট ছোট শিল্প জড়িত। বাংলাদেশে আমরা কী করতে পারি, সেই চ্যালেঞ্জ দেখানোর জন্য এবং নিজেদের সক্ষমতা জানার জন্য নতুন টাইপের এই তিন চাকার মোটরসাইকেল নির্মাণ প্রকল্প নিই। প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বুয়েট, চুয়েট ও রুয়েটের ৩৭ প্রকৌশলী নিরলস চেষ্টায় আল্লাহর রহমতে সফলভাবে করতে সক্ষম হয়েছি। ’

তিনটি বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে গাড়িটি বানিয়েছি, সেগুলো হচ্ছে কমফোর্ট, সেইফটি ও ব্রেক। এই মোটরসাইকেলে প্রিমিও গাড়ির সাসপেনশন লাগানোর কারণে ভ্রমণে মিলবে সেডান কারের স্বাদ। চার সিটের বাইকটি ব্যাটারিচালিত, যেটি এক ঘণ্টা চার্জে চার ঘণ্টা চলবে। গাড়ির গতি ঘণ্টায় ৪৫ কিলোমিটার রেকর্ড করা হয়েছে।

জানা গেছে, দেশে প্রথম গাড়ি সংযোজন কারখানা তৈরি করতে ২০১৫ সালে পিএইচপি ফ্যামিলি মালয়েশিয়ার বিখ্যাত গাড়ি নির্মাতা প্রোটনের সঙ্গে চুক্তি করে। ‘প্রোটন পিএইচপি’ নাম দিয়ে বছরে ১২০০ গাড়ি তৈরির লক্ষ্য নিয়ে ৪০০ কোটি টাকা বিনিয়োগে চট্টগ্রামে সর্বাধুনিক কারখানা স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়। প্রাথমিকভাবে চট্টগ্রামের হালিশহরে একটি কারখানা স্থাপন করে সেখানে প্রোটন গাড়ি সংযোজন শুরু হয়। সেই কারখানায় এই তিন চাকার মোটরসাইকেল নির্মাণ করা হয়।

পিএইচপি ফ্যামিলির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আকতার  বলেন, ‘গাড়ি নির্মাণে আমরা তিনটি প্রকল্প নিই—এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সময় দিয়েছি এই ভিক্টর সুফি (ভিএস)-১; অর্থাৎ তিন চাকার মোটরসাইকেল নির্মাণে। মালয়েশিয়ার প্রেসিডেন্ট মাহাথির মোহাম্মদের সঙ্গে সাক্ষাতে তাঁর কথায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ২০১৫ সালের শুরুতে এই চ্যালেঞ্জ নিই। ’

তিনি বলেন, এমনভাবে আমরা ডিজাইন করব যাতে বিদেশ থেকে আমদানি করতে না হয় এবং স্থানীয় যন্ত্রাংশ দিয়ে গাড়ি নির্মাণ করা। সেটি করতে আমরা সক্ষম হয়েছি। গাড়িটিতে সব যন্ত্রাংশই দেশের শীর্ষ কম্পানির, রয়েছে পিএইচপির যন্ত্রাংশও। বাইরে থেকে কোনো যন্ত্রপাতি বা যন্ত্রাংশ আমদানি করিনি। মোটর ইঞ্জিনটিও ১২৫ সিসির। ফলে গাড়িটি বাজারে গেলে যাতে সব যন্ত্রাংশ ও সার্ভিসিং আমরা তাত্ক্ষণিকভাবে দিতে পারি সেটি আমাদের আরেকটি লক্ষ্য ছিল। এ ছাড়া বিদেশিদের বদলে দেশীয় প্রকৌশলী দিয়ে করার উদ্দেশ্য হচ্ছে, আমার প্রকৌশলীরা আমার দেশের সড়ক, আবহাওয়া এবং গ্রাহকের চাহিদা নিখুঁতভাবে বুঝতে সক্ষম।

জানা গেছে, পিএইচপি অটোমোবাইলসের গবেষণা ও উন্নয়ন (আর অ্যান্ড ডি) বিভাগে কর্মরত ছিলেন ৩৭ জন চৌকস প্রকৌশলী। প্রশাসন ও কারখানার আরো ৭৩ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী মিলে গাড়িটি নির্মাণ করতে প্রায় দুই বছর লাগে।

এত গাড়ি থাকতে তিন চাকার মোটরসাইকেল নির্মাণের চিন্তা কেন প্রশ্নের জবাবে মাহাম্মদ মহসিন বলেন, ছোটবেলা থেকেই আমি ও ছোট ভাই আকতার পারভেজ হিরুর ঝোঁক ছিল পৃথিবীর বিখ্যাত গাড়ি সংগ্রহের। আমার ঘরে এখনো দুটি বিখ্যাত এন্টিক গাড়ি মরিস মাইনর (১৯৬৪) ও হিলম্যান মিন্যাক্স (১৯৬০) রয়েছে। মূলত নতুন কিছু করার শখ থেকেই এ গাড়ি তৈরির পরিকল্পনা। পিএইচপির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আকতার বলেন, ‘আমাদের কারখানায় মোটরসাইকেল হচ্ছে।

উল্লেখ্য, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে তিন চাকার মোটরসাইকেল বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু এর সঙ্গে এ গাড়ির পার্থক্য হচ্ছে এই গাড়ির সামনে দুই চাকা আর পেছনে এক চাকা। গত অক্টোবর মাসে জাপানের বিখ্যাত মোটর বাইক নির্মাতা ইয়ামাহাও তিন চাকার বাইক ‘নিকেন’ আনার ঘোষণা দিয়েছে কিন্তু সেটি স্পোর্টস বাইক। আর সেটি তেলচালিত। ২০০৬ সালে ইতালিয়ান কম্পানি পিয়াজিও তিন চাকার মোটর বাইক পিয়াজিও এমপি৩ বাজারে আনে। সেটিও দুই সিটের।

গাড়ির স্টিয়ারিং প্রথমে রড দিয়ে তৈরি হলেও পরে সেটি পাল্টে আরো আধুনিক করি, বডি ডিজাইন ও সাসপেনশন তদারকি করেন মোহাম্মদ মহসিন নিজে। একবার সাসপেনশন লাগিয়ে গাড়িটি ভাঙাচোরা সড়কে চালিয়ে দেখি পরে আবারও সাসপেনশন পরিবর্তন করে আরামদায়ক নিশ্চিত করি। এ ছাড়া গাড়িটির নিয়ন্ত্রণ যাতে সঠিক হয় সে জন্য তিন চাকায় তিনটি ব্রেক লাগাই। গাড়িটি নির্মাণের পর হালিশহরে কারখানার ভেতর আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে পরীক্ষামূলক চালান সম্পন্ন করি, এ ছাড়া চট্টগ্রাম-ঢাকা মহাসড়ক এমনকি চট্টগ্রাম শহরের ভাঙাচোরা সড়ক দিয়েই চালিয়ে আরাম ও নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করি। বিআরটিএ গাড়িটি চলার অনুমতি দিলে আমরা ব্যাটারি ও অকটেন দুই ধরনের জ্বালানিচালিত গাড়ি তৈরির পরিকল্পনা নিয়েছি। যাতে যে যার পছন্দমতো গাড়ি বেছে নিতে পারেন।

গাড়িটির দাম এখনো ঠিক হয়নি, তবে বিদ্যমান মোটরসাইকেল থেকে দাম একটু বেশি কিন্তু অটোরিকশা থেকে কম হবে। ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যেই আমরা বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনে যেতে প্রস্তুত। দেশের শোরুমের মাধ্যমে এটি বিপণন করব। সরকার আমাদের প্রকল্প অনুমোদন দিলে দেশের চাহিদা মিটিয়ে প্রয়োজনে আমরা বিদেশেও রপ্তানি করব।

জানা গেছে, গাড়িটিতে লেখা থাকবে ‘মেড ইন চিটাগাং’। কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, মেড ইন হংকং লিখতে পারলে মেড ইন চিটাগাং অনায়াসেই লেখা যাবে। চট্টগ্রামে তৈরি, চট্টগ্রামেই এর যন্ত্রাংশ মিলবে, তাই চট্টগ্রাম অগ্রাধিকার থাকবে। আগামীতে বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেবে চট্টগ্রাম। আমাদের কাউকে না কাউকে শুরু করতেই হবে, ভোগ করবে হয়তো পরবর্তী প্রজন্ম বা আমার সন্তান।

 

Print Friendly, PDF & Email
It's only fair to share...Share on FacebookShare on Google+Tweet about this on TwitterShare on LinkedIn

Leave A Reply