৩০শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ , রাত ১০:৫৯ , বৃহস্পতিবার

আমার দেখা উত্তর কোরিয়া

0

পশ্চিমা দুনিয়ায় মিডিয়া জুড়ে মিথ্যা প্রপাগান্ডা; পরাশক্তির রণ হুংকারে উকণ্ঠা নেই জনগণের ।।

শামসুল হক দুররানী : পরাশক্তিধর রাষ্ট্রের আক্রমণের হুমকী ধামকী, রণতরীর রণসজ্জা, নৌ-বহরের আক্রমন ঝুঁকি কোনটাই বিন্দুমাত্র বিচলিত করতে পারেনি উত্তর কোরিয়ার লড়াকু জনগণকে। উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেও শান্ত স্বভাবের মানুষগুলোর মনে কোন ভীতির সঞ্চার ঘটেনি। দেখে এলাম নিজের চোখে পিয়ং ইয়ং সিটিসহ উত্তর কোরিয়ার অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শহর জনপদের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ। এতোটুকুও ছন্দপতন ঘটেনি তাদের দৈনন্দিন জীবনে।

আমাদের ৯ সদস্যের বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলটিকে বিমানবন্দরে স্বাগত: জানান ক্ষমতাসীন ওয়ার্কাস পার্টির নেতৃবৃন্দ এবং কোরিয়ান জুছে আইডিয়া’র কর্মকর্তাবৃন্দ।
সফরের অভিজ্ঞতার বিস্তারিত ফিরিস্তি পরবর্তী সংখ্যায় প্রচারে আশা ব্যক্ত করে আজ শুধু এতটুকই বলতে চাই যে, বাইরে থেকে উত্তর কোরিয়া বা ডেমেক্রেটিক পিপলস্ রিপাবলিক অব কোরিয়াকে যেভাবে দেখা হচ্ছে এবং পশ্চিমা বিশ্বের মিডিয়া জুড়ে যে প্রপাগান্ডা ছড়ানো হচ্ছে, তা নিজ চোখে না দেখলে উপলব্ধি করা যেতো না।
১৫ এপ্রিল ভোরে ইন্টারন্যাশনাল ফাইভষ্টার হোটেল থেকে আমাদের নেয়া হয় উত্তর কোরিয়ার জাতীয় বীর মহান নেতা কিম ইল স্যুং’ প্যারেড স্কোয়ারে।

ঐদিন পশ্চিমা মিডিয়ায় খবর বের হয় উত্তর কোরিয়ার লোকজন নাকি পার্শ্ববর্তী দেশ চীনের সীমান্তের দিকে পালাচ্ছে। পিয়ং ইয়ং সিটি খালি হয়ে গেছে ইত্যাদি ভীতিকর অপপ্রচারে কোরিয়ার আম জনগণ হাসছিল। সফর সঙ্গীদের মধ্যে দু’একজন শীগগির সফর সংক্ষিপ্ত করে দেশে ফিরে যাবার কথাও ব্যক্ত করেন। কিন্তু ঐ দিন ছিলো গ্রেট লিডার কিম ইল স্যুং-এর ১০৫তম জন্মবার্ষিকী। সাথে ছিল বার্ষিক কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠান।  এ দিন ভোর ৪টা থেকে হোটেল থেকে শুনতে পাচ্ছিলাম প্যারেড গ্রাউন্ড থেকে ভেসে আসা গানের শব্দ। অর্থাৎ তাদের প্রস্তুতি ছিল সারা রাতের। পরদিন সকাল ৮টায় শুরু হয় মার্চপাস্টের আনুষ্ঠানিকতা। সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর তাক লাগানো সম্মিলিত মার্চপাস্ট উপভোগ করার মতো। কি পুরুষ কি মহিলা সবাই মিলে প্যারেডের যে নৈপূণ্য প্রদর্শন করে তা সারা জীবন মনে রাখার মতো। সারিবদ্ধভাবে পা নাক বরাবর উত্তোলন করে এক পা সামনে মাথা পেছনে হেলে বিকট শব্দে যে প্যারেড দেখলাম তাতে মনে হচ্ছিল এই বুঝি উল্টে পড়ে যাবে। পায়ের আর সামান্য ছন্দপতন ঘটলে গোটা কন্টিনজেন্টটাই হুমড়ী খেয়ে পড়বে একে অন্যের উপর। একটু এদিক সেদিক হলেই লন্ডভন্ড হয়ে পড়বে সব। কিন্তু না, বীরদর্পে সাঁই সাঁই শব্দে একে একে প্রতিটি গ্রুপ মার্চপাস্ট করে সুশৃংখ্যলভাবে চলে যেতে থাকে। এ দিন প্যারেড গ্রাউন্ডে প্রায় ১০ লাখ সৈন্যের সমাবেশ ঘটেছিল। সবশেষে ১৬ থেকে ২০ চাকার ভারী যানবাহনে বিশালাকার আন্ত:মহাদেশীয় স্কাড ক্ষেপণাস্ত্র, শত্রু পক্ষের দেশ থেকে ছোঁড়া মিসাইল বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র, হাইড্রোজেন বোমাসহ সম্পূর্ণ নয়া প্রযুক্তির সর্বাধূনিক ক্ষেপণাস্ত্রের বহর আর সারি সারি ট্যাংক বহর গোটা পরিবেশকে উদ্বেলিত করে তোলে। মুহুর্মুহু করতালির মধ্যে কোরিয়া’র নেতা কিম জং উন-এর অভিবাদন গ্রহণ অনুষ্ঠানটিকে করে তোলে প্রাণবন্ত।
আমরা ছিলাম কিম ইল স্যুং স্কোয়ারের বিশেষভাবে সংরক্ষিত দর্শক পোডিয়ামের দোতলায়। আর উত্তর কোরিয়ার অবিসংবাদিত নেতা কিম জং উন ছিলেন আমাদের এক ধাপ উপরে খোলা ছাদে। সেখান থেকে তিনি আমন্ত্রিত অতিথিদের হাত নেড়ে বারবার স্বাগত: জানাচ্ছিলেন। এ সময় আকাশে উড়ে আসে ঝাঁকে ঝাঁকে অত্যাধুনিক জঙ্গী বিমান।

আকাশে কিম ইল স্যুং-এর ১০৫তম জন্মবার্ষিকী লেখা ভেসে উঠে। সম্পুর্ণ বিমানবহর দিয়ে ১০৫ লেখা উড়ে যেতে দেখা এমন অভূতপূর্ব বিরল দৃশ্য কার না ভাল লাগে। বিমানগুলো এমনভাবে বারবার উড়ে আসছিল যে একটি অক্ষরও এদিক সেদিক হয়নি।

উত্তর কোরিয়া নিয়ে আমেরিকার রণহুংকারে বিশ্ববাসী বিচলিত এবং শংকিত থাকলেও বাস্তবচিত্র ভিন্ন। সামান্যতম উদ্বেগ- উতকন্ঠার লেশমাত্রও দেখা যায়নি দেশটির শান্তশিষ্ট জনগণের মাঝে। (চলবে)

 

Print Friendly, PDF & Email
It's only fair to share...Share on FacebookShare on Google+Tweet about this on TwitterShare on LinkedIn

Leave A Reply